আমার রবীন্দ্রনাথ
অশোক সরকারের জীবনের চলার পথে রবীন্দ্রনাথকে পাওয়ার কাহিনী

যে কথা কখনো লিখিনি তা লিখতে গেলে অনেক কথা ভিড় করে আসে। সব কথাই বলতে চায় আমায় লেখ আমায় লেখ, তাই কোনটা লিখি আর কোনটা রাখি বেছে নিতেই সময় যায় পেরিয়ে। তবু যখন লেখার ফরমাশ এসেছে তখন লিখতেই হবে।
জন্মের পর থেকে ২২ বছর শান্তিনিকেতনে বেড়ে ওঠা আর তার পরে আরও ৪০ বছর নিবিড় যোগাযোগ কম সময় নয়। বাড়ির বাইরে প্রথম নিয়মিত পা রেখেছি আনন্দ পাঠশালায় যাব বলে। ইংরেজি ভাষায় তাকে হয়ত নার্সারি স্কুল বলবে, আমাদের কাছে তা ছিল আনন্দেরই পাঠশালা। রবীন্দ্রনাথকে পাওয়ার শুরু সেখানেই, যদিও এই প্রতিষ্ঠানটির জন্ম হয়েছে তাঁর মৃত্যুর ১৬-১৭ বছর পরে। চার বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথকে কিভাবে পেলাম বোঝার ক্ষমতা হয়নি। পরে বুঝেছি পাঠশালার সঙ্গে আনন্দের সম্পর্কটা যে নিবিড় সেই বোধটি রাবীন্দ্রিক। গাছ গাছালি, ফল ফুল, পশু পাখি, পোকা মাকড় যে আমাদের জীবনের বেড়ে ওঠার সঙ্গী, সেটা ওই বয়সেই বুঝে গিয়েছিলাম। তাই আমার ও আমার মত অনেকেরই গাছতলার ছায়া, গাছের ডাল, পাখির কলরব, ফুলের রং আর সুগন্ধ ভাল লাগতে শুরু করেছিল। বরং দেহলী বাড়ির বারান্দায় বসে অ আ ক খ শিখতে গেলে মন উসখুস করত, ওই বোধহয় কাঠবেড়ালিটা পালিয়ে গেল, পাশ দিয়ে প্রজাপতি উড়ে গেলে মনকে শান্ত রাখা কঠিন হত।
আনন্দ পাঠশালায় লেখা পড়া কি শিখেছিলাম বিশেষ মনে নেই, কিন্তু প্রকৃতি বিষয়ে আন্তরিক আগ্রহ সেখান থেকেই জন্মেছিল। প্রকৃতিকে আপন করে দেখা, এ তো রবীন্দ্রনাথেরই অবদান। দু বছর পেরোলে ভর্তি হলাম পাঠভবনে। হাতে কয়েকটি বই খাতা আর একটা মাটিতে বসার আসন। বই খাতা আর আসনগুলি বিশ্বভারতী সমবায় থেকে কেনা, বাবা কিনে এনেছিলেন। এই সমবায় ১৯১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত। ভারতে বোধহয় একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যার নিজস্ব marketing cooperative আছে। বিশ্বভারতীর নিজস্ব সমবায় ব্যাঙ্কও আছে। ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত, এখনো রমরমিয়ে চলছে। সমবায়ের উদ্যোক্তা রবীন্দ্রনাথ নিজে। তখনো বিশ্ববিদ্যালয় হয় নি। কিন্তু বিদ্যালয় ছিল আর ছিল আশ্রম। সেখানকার অধিবাসীরা যাতে সুষ্ঠু দামে সংসারের জরুরি জিনিষপত্র পেতে পারে সেই থেকে সমবায়ের ভাবনা। একই সময় থেকে শান্তিনিকেতনের আশে পাশের গ্রামগুলিতেও সমবায় তৈরির কাজ শুরু হয়। ১৯৬২ সালে যখন স্কুলে ভর্তি হচ্ছি তখন সমবায়টি আবার নতুন করে শুরু হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে কিছুদিন অর্থাভাবে বন্ধ ছিল। বলা বাহুল্য তখন সমবায়ের মূল্য জানতাম না। পরে জানতে গিয়ে পড়তেই হয়েছে রবীন্দ্রনাথের সমবায় ভাবনা ও কাজের কথা। পড়তে হয়েছে তাঁর লেখা সেই পথিকৃৎ বই — সমবায় নীতি, The Cooperative Principle।
যাই হোক ১৯৬২ সালে পাঠভবনে ভর্তি হলাম। এই স্কুলটির তখন ৬১ বছর বয়স হয়ে গেছে। গাছ তলায় ক্লাস তখনো আছে। গোল হয়ে বসা একদিকে মেয়েরা একদিকে ছেলেরা। গোলের মাঝখানে দাদা বা দিদি। মানে শিক্ষক বা শিক্ষিকা। হ্যাঁ ছোটবেলা থেকেই তাঁদের অমুক দা তমুকদি বলে ডাকতাম। স্যার ম্যাম কথা দুটি প্রথম বাইশ বছরে শুনিনি। ফার্স্ট বেঞ্চ লাস্ট বেঞ্চ নেই, ভাল ছাত্ররা সামনে, গাধা ছাত্ররা পিছনে – এসব নেই। স্কুল ইউনিফর্ম নেই। আসন পেতে হাঁটু মুড়ে বসা, মাটিতে খাতা বই রেখে পড়াশোনা। এক গাছ তলা থেকে আরেক গাছ তলা। নিরঞ্জনদার বেদী থেকে নন্দিতাদির বেদি। একটু বড় হতে স্পষ্ট জেনেছিলাম ব্রিটিশদের তৈরি আধুনিক স্কুলের আদব কায়দা থেকে আলাদা শিক্ষা সংস্কৃতি তৈরির চেষ্টার অন্তর্গত ছিল এই সম্বোধন বা ক্লাসের গঠন। আমাদের ছোটবেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সুধীরঞ্জন দাস, তাকে সুধী দাদু বলে ডাকতাম, পরে উপাচার্য হলেন বিখ্যাত দার্শনিক কালিদাস ভট্টাচার্য। তাঁকে কালিদাসদা বলে ডাকতাম।
পর পর অনেকগুলি বিশাল গাছের ছায়ায় মোরাম দিয়ে আর ইটের বর্ডার দিয়ে ক্লাসের জন্য জায়গা তৈরি করা ছিল, মাঝখানে একটা সামান্য উঁচু বেদী, পাশে কাঠের স্ট্যান্ডে রাখা ব্ল্যাক বোর্ড। সারা স্কুল জীবন এই গাছ তলাতেই ক্লাস করেছি। বৃষ্টি হলে কয়েকটি বাড়ির বারান্দায় ক্লাস হত। বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরি-র ক্লাস করতেই একমাত্র ঘর বন্দি হওয়া, নয়ত লাইব্রেরিতে। পাঠভবনে পড়ার বিষয়ের পাশাপাশি গানের ক্লাস ছিল আবশ্যক। স্কুলের গণ্ডি পেরোনো পর্যন্ত গানের ক্লাস আবশ্যক ছিল। গাছের তলায় বসে সীতাংশুদার গানের ক্লাসে আমরা একসঙ্গে সমস্বরে গান করতাম। বাংলা মিডিয়াম স্কুল কাজেই বাংলার উপর বিশেষ জোর ছিল। বেশির ভাগি রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়তে হত। গদ্য এবং কবিতা দুইই। সেই স্কুলে থাকতেই জীবনস্মৃতি (রবীন্দ্রনাথের লেখা আত্মজীবনী) পড়েছি।
স্কুল জীবনে রবীন্দ্রনাথকে অনুভব করেছি নানা ভাবে। সকালের বৈতালিক (prayer), সন্ধ্যায় সাহিত্য সভা, দল বেধে রবীন্দ্রনাথের নাটক মুকুট, ডাকঘর, ও অন্যান্য নাটক মঞ্চস্থ করা থেকে অনেক কিছু। রবীন্দ্রসঙ্গীত আমাদের জীবনের অঙ্গ ছিল। মনে আছে একটা গান শিখিয়েছিলেন গানের শিক্ষক সীতাংশুদা – কাঁটা বন বিহারিণী – আমরা কেউই বিশ্বাস করিনি এ গানটা রবীন্দ্রনাথের লেখা। বেসুরো একদল গাইয়েদের নিয়ে ব্যঙ্গ করে লেখা সে গান। বাড়ি এসে গীতবিতান খুলে খুঁজে খুঁজে বের করেছিলাম গানটি সত্যিই গীতবিতানে আছে কিনা।
বিশেষ আকর্ষণ ছিল প্রকৃতি পাঠ ক্লাসটি। আমাদের শিক্ষক বারিন দা বলতেন প্রকৃতির কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে, আর মনে রাখবে প্রকৃতি আছে বলে আমরা আছি। ওই ক্লাসেই তিনি আমাদের দল বেঁধে নানা দিকে ঘুরতে নিয়ে যেতেন। গাছপালার নাম জেনেছি, পোকা মাকড় সম্পর্কে বুঝতে শিখেছি, নানা পশু পাখির চলাফেরা দেখতে শিখেছি। ভেলভেট পোকা বলে একটি পোকা আমাদের খুব প্রিয় ছিল। আমারা হাতের তালুতে তাকে নিতাম আবার ছেড়ে দিতাম। বারিন দা কোন পোকাকে কৌটো বন্দি করলে খুব রেগে যেতেন- বলতেন আমাদের মত ওদেরও স্বাধীন জীবন আছে।
রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন মানুষের জীবন দু রকমের – একটা জীবন সে যাপন করে যার জন্য খেতে লাগে, লেখাপড়া লাগে, কামকাজ লাগে; আরেকটা জীবন সে ধারণ করে, সেই জীবনে সে গান গায়, ছবি আঁকে, অভিনয় করে, আনন্দে ভরিয়ে তোলে নিজেদের জীবন। জীবনকে পূর্ণ করতে দুটোই লাগে।
আমাদের স্কুল জীবনের শান্তিনিকেতনে ছিল বারো মাসে তেরো পার্বণ। নানা উৎসব অনুষ্ঠানে ভরা। পয়লা বৈশাখেই রবীন্দ্র জন্মদিন পালন করা হত। এই প্রথা রবীন্দ্রনাথের সময় থেকেই চলে আসছে। শান্তিনিকেতনে গরমকালে তীব্র গরম আর জলকষ্ট ছিল তাই ১লা মে থেকেই গরমের ছুটি পড়ে যেত, সে জন্য ১৪ই কি ১৫ই এপ্রিল পয়লা বৈশাখেই তাঁর জন্মদিন পালন করা হত। তা ছাড়া ছিল বসন্ত উৎসব, বর্ষা মঙ্গল, শারদোৎসব, বৃক্ষরোপণ, মাঘোৎসব, পৌষমেলা ইত্যাদি। এসবই আশ্রম জীবনের অঙ্গ ছিল। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন মানুষের জীবন দু রকমের – একটা জীবন সে যাপন করে যার জন্য খেতে লাগে, লেখাপড়া লাগে, কামকাজ লাগে; আরেকটা জীবন সে ধারণ করে, সেই জীবনে সে গান গায়, ছবি আঁকে, অভিনয় করে, আনন্দে ভরিয়ে তোলে নিজেদের জীবন। জীবনকে পূর্ণ করতে দুটোই লাগে। তাই আমাদের জীবনে লেখাপড়াও যেমন ছিল তার সঙ্গে ছিল আনন্দ উৎসবে ভরা শৈশব, আর কৈশোর। গান, নাটক, অভিনয়, লেখা আবৃত্তি, সাহিত্য সভা দিয়ে ভরা আনন্দময় জীবন।
আনন্দের সঙ্গে দায়িত্বও ছিল। নানা উৎসবে অনুষ্ঠানের সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতাম আমরা। সাহিত্য সভা আয়োজন করা তো আমাদেরই কাজ ছিল। আমরাই জায়গা ঠিক করতাম, সভাপতিকে রাজি করাতাম, কে কোন লেখা পড়বে, আবৃত্তি করবে গান গাইবে ঠিক করতাম। যাতে দর্শক সমাগমে কমতি না হয়, তার চেষ্টা করতাম। ছাত্রদের পত্রিকা ‘আমাদের লেখা’ বেরোতো প্রতি বছর। বড় ক্লাসে সেই পত্রিকার আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছি।
শান্তিনিকেতনের যদি সংস্কৃতির আর মানব মনের সাধনা হয়ে থাকে, তাহলে শ্রীনিকেতন হল দেশের ভবিষ্যতের সাধনা।
অষ্টম ক্লাসে যখন উঠেছি তখন বাবা বদলি হয়ে গেলেন শ্রীনিকেতনে। শান্তিনিকেতন থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পশ্চিমে ১৯২২ সাল থেকে গড়ে উঠেছিল শ্রীনিকেতন। শান্তিনিকেতনের সঙ্গে তার অনেক তফাত। শান্তিনিকেতনের যদি সংস্কৃতির আর মানব মনের সাধনা হয়ে থাকে, তাহলে শ্রীনিকেতন হল দেশের ভবিষ্যতের সাধনা। এখানেই গড়ে উঠেছিল ডেয়ারি, কৃষি কলেজ, পল্লী সংগঠন বিভাগ, পল্লী চর্চা কেন্দ্র, শিল্প সদন ও রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় স্কুল শিক্ষাসত্র। শ্রীনিকেতনে আমরা চার বছর ছিলাম। তখন এক অন্য রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় ঘটল। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ৩৯টি গ্রামে পল্লী উন্নয়নের কাজ হচ্ছে, গ্রামের ছেলেদের গ্রামীণ জীবনকে ঘিরে শিক্ষাক্রম তৈরি হয়েছে শিক্ষা সত্রে, একাধিক বৃত্তি শিক্ষার প্রশিক্ষণের জন্য আছে পল্লী চর্চা কেন্দ্র, শিল্প সদনে পুরুষ নারী ছেলে মেয়ে শিশুদের কাপড় জামা তৈরি শেখানো হচ্ছে আর তার বিক্রয় কেন্দ্র আছে। যেখানে থাকতাম তার গায়েই ছিল কৃষি কলেজ। রবীন্দ্রনাথের সময়ে কৃষি কলেজ ছিল না, কিন্তু কৃষির প্রশিক্ষণ হত শ্রীনিকেতনে।
এসবেরই শুরুয়াৎ হয়েছে ১৯২২ সালে রবীন্দ্রনাথেরই উদ্যোগে। শ্রীনিকেতনের নিজস্ব উৎসব ছিল হলকর্ষণ আর শ্রীনিকেতন মেলা। হলকর্ষণ বর্ষার চাষের শুরুর অনুষ্ঠান, হত অগস্ট মাসে, আর শ্রীনিকেতন মেলা হত ফেব্রুয়ারি মাসে, যখন ফসল উঠেছে। স্কুলে পড়ার সময় এসবের মাহাত্ম্য অতটা বুঝিনি। তবে একেবারে বুঝিনি তাও নয়। ওই সময়েই পশ্চিমবঙ্গে নকশাল আন্দোলন শুরু হয়, ১৯৭০ সাল নাগাদ তা শান্তিনিকেতন শ্রীনিকেতনেও আসে, নকশালরা রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগর সবাইকেই আক্রমণ করে। তার আঁচ আমাদের গায়েও এসে লাগে। তখন একাধিক অনুষ্ঠানে বক্তারা রবীন্দ্রনাথের পল্লী ভাবনার মধ্যে যে রুপান্তরি চিন্তা ছিল তার কথা বলেন। সবটা না বুঝলেও আলগা আলগা বুঝতে পারছিলাম মতাদর্শের জগতে একটা বড় বিরোধ হচ্ছে। অনেক পরে বুঝেছি শহর সভ্যতার পাশাপাশি গ্রামকেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন থেকে তৈরি হয়েছিল শ্রীনিকেতন। যারা খবর রাখেন তাঁরা জানেন ১৯২৪ এর পর থেকে ক্রমশ রবীন্দ্রনাথও শ্রীনিকেতনের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেন, তিনি মনে করেছিলেন ভবিষ্যতের ভারতবর্ষ গড়তে গেলে তার রূপরেখাটি গ্রাম থেকেই তৈরি করতে হবে।
১৯৭১ সালে আমরা শান্তিনিকেতনে ফেরত চলে এলাম। তখন থেকে ১৯৭৭ এই ছয় বছর স্কুল কলেজে কাটানোর সুবাদে শান্তিনিকেতনে ছিলাম। তখন যুবা বয়সে রবীন্দ্রনাথকে একটু ভালো করে বোঝার সুযোগ হয়, চণ্ডালিকা চিত্রাঙ্গদা নাটক তো শিশু বয়স থেকে দেখে আসছি, কিন্তু সে নাটকের গভীর সামাজিক মেসেজ বুঝতে পেরেছি সেই সময়ে। একই সময়ে রক্তকরবী নাটকটি অনুষ্ঠিত হয়, সেই নাটক আমায় ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। সেই প্রথম একনায়কতন্ত্রের স্বরূপটি দেখতে পেয়েছিলাম। সেই সময় রবীন্দ্রনাথের দুটি উপন্যাস পড়ার সুযোগ হয়, গোরা আর ঘরে বাইরে, আর কিছু ছোট গল্প। উপন্যাস দুটিই স্বদেশী আইডিয়াকে ঘিরে লেখা। ওই একই সময়ে গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যেকার মতাদর্শের বিরোধের কথা প্রথম শুনতে পাই। যদি অনেক পরে, সব্যসাচীদার (সব্যসাচী ভট্টাচার্য) লেখা বইটি এই বিষয়ে বিস্তৃত আলোকপাত করে।
১৯৭৭ সালে শান্তিনিকেতন থেকে উচ্চ শিক্ষার্থে অন্যত্র চলে যাই, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সংস্পর্শ ত্যাগ করিনি। গান গাইতে হলে গলায় এখনো রবীন্দ্রসংগীতই আসে, আমার পড়ানোর সূত্রে রবীন্দ্রনাথ বার বার ফিরে ফিরে আসেন সমবায়ের সূত্রে, পল্লী উন্নয়নের সূত্রে, অন্য শিক্ষা ব্যবস্থার সূত্রে। আজকে জাতীয়তাবাদের যে রূপ দেখতে পাই সেই রূপটি বিষয়ে ১৯১৬ সালে লেখা রবীন্দ্রনাথের সাবধানবানী আমার এখনো পাথেয়। বসন্ত উৎসব বর্ষামঙ্গল, শারদোৎসব ইত্যাদিকে ঘিরে সেকুলার উৎসব তথা মানব মিলনের যে ধারা রবীন্দ্রনাথ আমাদের দিয়ে গেছেন, আজকের বিকৃত ধার্মিক সংস্কৃতির বিকল্প হিসেবে তার মূল্য যে কতখানি তা বলার নয়। আর আজকের শিক্ষার সংকটের এই দুর্দিনে শুধু মনে হয় আমরা কতখানি ভাগ্যবান যে শান্তিনিকেতন শ্রীনিকেতনে থাকার ও পড়ার সুযোগ পেয়েছি। আর হ্যাঁ যে কথাটা আজ বড্ড ফ্যাশন হয়ে গেছে – পরিবেশ- সেই চেতনারও আমাদের কাছে একটাই উৎস, রবীন্দ্রনাথ।
লেখক সম্পর্কে
অশোক সরকারের স্কুল ও কলেজ জীবন কেটেছিল শান্তিনিকেতনে ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে। তাঁর পিতামাতা জীবনের ৭০ সাল শান্তিনিকেতনে কাটিয়েছেন, সেই সুবাদে পরবর্তী ৪০ বছর ধরে অশোকের শান্তিনিকেতনের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ। গত ১৪ বছর ধরে অশোক আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এক সহ লেখকের সঙ্গে লেখা তাঁর বই কবির পাঠশালাঃ পাঠভবন ও শিক্ষাসত্রের ইতিহাস ও তার ইংরেজি অনুবাদ The Poet’s School: The History of Patha Bhavan and Sikshasatra, রবীন্দ্রনাথের হাতে গড়া দুই বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের প্রামাণ্য কাহিনী।

